Tuesday, January 10, 2017

কোটা বিড়ম্বনায় মেধা বিনাশ

কোটা বিড়ম্বনায় মেধা বিনাশ
দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি সরকারি চাকরি লাভের ক্ষেত্রেকোটাপদ্ধতির কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী ঝরে পড়ছে কোটার কারণে বঞ্চিত হচ্ছে জাতির মেধাবী মুখগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, সরকারি চাকরি, বিসিএস, প্রাইমারি স্কুলের চাকরিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে মেধাবীরা আটকে যাচ্ছে কোটার জালে মেধাবীরা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল লাভ করেও কোটার কারণে সরকারি চাকরি ভর্তি ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের কাছে হেরে যাচ্ছে



পরিস্থিতি যদি আর কয়েক বছর চলতে থাকে, তবে প্রশাসনসহ সর্বস্তরে মেধাবীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশংকা দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা চাকরিসহ সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে জালের মতো চারদিক বেষ্টন করে আছে কোটা কোটার এমন অপব্যবহারের কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে সৃষ্টি হচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত নেতিবাচক পরিস্থিতির মেবাধী তরুণদের বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের দিয়ে নানা অপকর্ম করে স্বার্থ হাসিল করছে স্বার্থান্বেষী মহল

জীবিকার তাগিদে অনেকে আবার জড়িয়ে পড়ছে মাদক, চোরাচালান পাচারের মতো জঘন্য সমাজবিরোধী কাজে অনেকে প্রযুক্তিগত অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গি সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ছে হতাশাগ্রস্ত তরুণদের অনেকেই পরিবার তরুণদের মধ্যে বাড়ছে পারিবারিক কলহ দরিদ্র বাবা-মা স্বপ্ন মরীচিকায় রূপ নিচ্ছে এমন বৈষ্যমের কারণে আমরা ব্যক্তিগত রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় ধরনের ক্ষতির দিকে ধাবিত হচ্ছি যারা মেধা তালিকায় স্থান পায় না, তারা মেধা তালিকায় স্থান পাওয়াদের থেকে যে কম যোগ্যতাসম্পন্ন তা কাগজে-কলমে স্বীকৃত কোটা পদ্ধতিতে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অযোগ্যদের দ্বারাই যোগ্যরা হচ্ছে বঞ্চিত দক্ষকে বঞ্চিত করে অদক্ষকে সে স্থানে বসালে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়
 
অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক নিবিড় দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাকে করতে হবে মানসম্পন্ন মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য চাই যোগ্য শিক্ষক যেখানে যোগ্যরা বাদ পড়ছে কোটার কারণে, সেখানে শিক্ষা কতটা মানসম্পন্ন হবে তা সহজেই অনুমেয় একই ব্যাপার ঘটছে প্রশাসন, চিকিৎসাসহ সব সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সব ক্ষেত্রে অযোগ্যদের স্থান করে দেয়া কোটা ব্যবস্থা আমাদের ভাগ্যে ক্রমান্বয়ে অন্ধকার ডেকে আনছে
 
বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনি, নারী, পোষ্য, জেলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (উপজাতি), প্রতিবন্ধী, খেলোয়াড়সহ ২৫৭ ধরনের কোটা রয়েছে মেধাবী যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও যে জাতির মেধাবীদের ঝরে পড়তে হয়, সে জাতির মতো দুর্ভাগা আর হতে পারে না কোটার মেধা বিনাশের সমীকরণ দেখলে চোখ কপালে উঠে যায় আর এক আকাশ হতাশা বাসা বাঁধে মেধাবীদের আশার আকাশে সরকারি চাকরির ১ম ২য় শ্রেণীর ৫৬ শতাংশই কোটাধারীদের দখলে

অন্যদিকে ৩য় ৪র্থ শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে ৭০ শতাংশ নিয়োগ দেয়া হয় কোটা থেকে, আর বাকি ৩০ শতাংশ মেধা তালিকা থেকে এদিকে বিসিএসে মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ দেয়া হয় ৪৫ শতাংশ, আর বাকি ৫৫ শতাংশই নিয়োগ দেয়া হয় কোটা থেকে কোটার চিত্র থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা পদ্ধতি আমাদের মেধার বিকাশে, মেধাবী জনগোষ্ঠী সৃষ্টিতে এবং দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে রয়েছে
 
কোটার কারণে প্রশাসনে হাজার হাজার পদ খালি থাকছে ২৮তম থেকে ৩২তম ৫টি বিসিএসের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যোগ্য প্রার্থী না থাকায় বিভিন্ন কোটার হাজার ২৮৭টি পদ খালি রাখতে হয়েছে কোটার শূন্যপদগুলো পূরণ করতে মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী মহিলাদের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি ওই বিসিএসেও হাজার ১২৫টি পদ শূন্য রাখতে হয় পরে ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে তা পূরণের সিদ্ধান্ত হয় অথচ ৩২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৯১২ জনই চাকরির সুযোগ পাননি কারণ এক কোটা থেকে আরেক কোটায় নিয়োগ দেয়া যায় না এর আগে ২০০৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৮৩৩টির মধ্যে ৭৭৮টি, ২০০৫ সালে হাজার ৮৫৪টির মধ্যে হাজার ৫০৮টি, ২০০৬ সালে ৭৫৪টির মধ্যে ৫৯৮টি এবং ২০০৭ সালে ৭০৯টির মধ্যে ৬৩৭টি পদ খালি রাখতে হয়েছে কোটার কারণে
উপরোক্ত সমীকরণ মেধাবীদের হতাশার জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে তরুণরা উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের পড়ালেখা বাদ দিয়ে উপার্জনে নামিয়ে দিচ্ছে কোটা পদ্ধতি সরকারের প্রশাসনে যেমন অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের স্থান করে দিচ্ছে, তেমনি প্রশাসনে রাখছে অনেক পদ খালি ফলে দেশ তার কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে কোটা পদ্ধতি বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯() ধারার সুস্পষ্ট বিরোধী যেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবেঅথচ কোটার নামে বৈষম্যমূলক পদ্ধতি চালু রাখা হয়েছে
কোটা পদ্ধতির সংস্কার করে এটিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সরকারের একান্ত দায়িত্ব দেশের যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা মূলত মেধাবীদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে যারা কোটার মাধ্যমে চাকরি বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ পাচ্ছে তারাও মেধাবী তবে তারা যদি সত্যিকার মেধাবী হয়ে থাকে, তাদের তো কোনো ধরনের কোটার সুযোগ গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না যথাযথ প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখা বাঞ্ছনীয় এর পরিবর্তে কোটার ভিত্তিতে সহজেই সুযোগ পাওয়া নিশ্চিতভাবেই তাদের মেধার প্রতি অবিচারের শামিল এবং এটি অসম্মানজনকও বটে
 
উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই কোটার প্রচলন আছে তবে তা বাংলাদেশের মতো প্রবল আকারে নয় যুক্তরাষ্ট্রে কোটাধারীদের আগেই একটা নম্বর দিয়ে দেয়া হয় তারপর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদের উত্তীর্ণ হতে হয় ভারতে কোটার সুযোগ একবার গ্রহণ করা যাবে কেউ একবার কোটার সুযোগ নিলে সে জীবনে আর কোটার সুযোগ গ্রহণ করতে পারবে না দেশে মেধার বিকাশকে অবারিত করতে এবং দক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে কোটা পদ্ধতির সংশোধন প্রয়োজন ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি চাকরি পর্যন্ত ধারাবাহিক যে কোটা সুবিধা রয়েছে, তা কমানো দরকার একবার যে কোটা সুবিধা পাবে, সে আর কখনও সুবিধা পাবে না কেউ কোটা দিয়ে স্কুল বা কলেজে ভর্তি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সে সুবিধা পাবে না বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা ভোগ করতে পারবে না দেশের দ্রুত সমৃদ্ধি উন্নয়নে কোটা পদ্ধতিতে ধরনের সংস্কার অপরিহার্য
 
Source : Daily Jugantor , জিকে সাদিক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া


No comments:

Post a Comment